মরিয়মের মৃত্যু:নিছক আত্মহনন,নাকি সুনিপুণভাবে সাজানো চিত্রনাট্য?
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্যের দ্বিতীয় স্ত্রী,মাত্র ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধারের পর জেগে উঠেছে একাধিক অমীমাংসিত প্রশ্ন — শেরেবাংলা নগরের সুরক্ষিত এক ফ্ল্যাটে।
●
শেরেবাংলা নগর,ঢাকা
ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দু শেরেবাংলা নগর। চারদিকে কড়া নিরাপত্তা আর সিসিটিভির কড়া নজরদারি। এই সুরক্ষিত বলয়ের ভেতরেই ন্যাম ভবনের ৫ নম্বর বিল্ডিংয়ের ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটটি এখন এক গভীর রহস্যের কেন্দ্রবিন্দু। রোববার বিকেলে সেখান থেকেই উদ্ধার হলো সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য জিএম নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী,মাত্র ১৯ বছর বয়সী মরিয়ম খাতুনের ঝুলন্ত দেহ।
এটি কি কেবলই এক অভিমানী কিশোরীর আত্মহনন,নাকি সুরক্ষিত দেয়ালের ভেতরে সুনিপুণভাবে সাজানো কোনো চিত্রনাট্য? একজন অনুসন্ধানী সাংবাদিক হিসেবে গত দুই দশকে বহু ঘটনার ব্যবচ্ছেদ আমি করেছি,কিন্তু এই ঘটনাটির পরতে পরতে লুকিয়ে আছে এমন কিছু অমীমাংসিত প্রশ্ন — যা যেকোনো থ্রিলার গল্পকেও হার মানায়।
সেই রহস্যময় ৯০ মিনিট
দুপুর গড়িয়ে বিকেল। জানা যাচ্ছে,এমপি নজরুল ইসলাম তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে একসঙ্গেই দুপুরের খাবার খেয়েছেন। এরপর বিশ্রামের জন্য যে যার রুমে চলে যান। বাহ্যিকভাবে সবকিছুই ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক। কিন্তু মাত্র দেড় ঘণ্টার ব্যবধানে পুরোপুরি পাল্টে যায় দৃশ্যপট।
মাত্র ৯০ মিনিটের এই নিস্তব্ধতায় ওই চার দেয়ালের ভেতর ঠিক কী ঘটেছিল? কোনো শব্দ,কোনো বাকবিতণ্ডা কেন কারও কানে পৌঁছাল না?
দরজা,চেয়ার এবং কিছু প্রশ্ন
পুলিশ এবং সিআইডির ফরেনসিক দল পৌঁছানোর আগ পর্যন্ত পুরো জায়গাটি ঘিরে রাখা হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি অস্পষ্ট ভিডিওতে দেখা যায়,ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত দেহের ঠিক নিচেই পড়ে আছে একটি চেয়ার। আপাতদৃষ্টিতে এটি আত্মহত্যার একটি নিখুঁত ফ্রেম। কিন্তু আইনের চোখ এখানেই খটকা তৈরি করে।
এই একটিমাত্র প্রশ্নের উত্তরের ওপরই নির্ভর করছে পুরো ঘটনার মোড়।
কোনো আকস্মিক মানসিক আঘাত,নাকি অন্য কিছু?
জুলাইয়ের সেই ভিডিও এবং তাড়াহুড়ো করা বিয়ে
মরিয়ম খাতুনের এই মর্মান্তিক পরিণতির পেছনের গল্প খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে খুব বেশি দিন নয়,মাত্র কয়েক মাস আগে। গত জুলাই মাসে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে একটি ব্যক্তিগত ভিডিও,যা জন্ম দেয় তীব্র বিতর্কের। পরিস্থিতি সামাল দিতে এমপি গাজী নজরুল ইসলাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করেন — মরিয়ম তার দ্বিতীয় স্ত্রী। দাবি করা হয়,প্রথম স্ত্রীর সম্মতিতেই গত ১৭ জুন পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়েছে। প্রথম স্ত্রীও ভিডিও বার্তায় সেই দাবি সমর্থন করেন।
কিন্তু কাবিননামা,বায়োডাটা আর বিয়ের তারিখ নিয়ে শুরু থেকেই ছিল নানা অসংগতি,যা আজও পুরোপুরি স্পষ্ট নয়। একটি বিতর্কিত ভিডিও ধামাচাপা দিতেই কি তড়িঘড়ি করে এই বিয়ের নাটক সাজানো হয়েছিল? সেই বিতর্কের মানসিক চাপই কি মাত্র ১৯ বছর বয়সে মরিয়মকে এমন পরিণতির দিকে ঠেলে দিল?
সত্য হয়তো বের হয়ে আসবে,কিন্তু একটি তরতাজা প্রাণের অকাল প্রস্থান আমাদের আবারও মনে করিয়ে দিল — ক্ষমতার ঝলকানির পেছনেও কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে নিকষ কালো অন্ধকার।
ন্যাম ভবনের ওই ফ্ল্যাটটি এখন নীরব। ফরেনসিক রিপোর্ট আর ময়নাতদন্তের ফলাফলের দিকেই তাকিয়ে আছে প্রশাসন। হয়তো খুব শিগগিরই ‘হত্যা’বা ‘আত্মহত্যা’র একটি আইনি ট্যাগ লেগে যাবে এই ফাইলের ওপর। কিন্তু সচেতন মহলে এবং সোশ্যাল মিডিয়ার পাতায় প্রশ্ন একটাই — ক্ষমতার সুরক্ষিত ছায়ায় ১৯ বছরের একটি জীবন কি আসলেই নিজের ইচ্ছায় ফুরিয়ে গেল,নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে এমন কোনো সত্য যা ওই ২০৩ নম্বর ফ্ল্যাটের চার দেয়ালের ভেতরেই চিরতরে চাপা পড়ে গেল?



