নিজস্ব প্রতিনিধিঃ সাতক্ষীরার দেবহাটা উপজেলায় গবাদিপশু চিকিৎসকের ভুল ইনজেকশনে ২ সন্তানের জননীর মর্মান্তিক মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পোস্টমর্টেম ছাড়াই তড়িঘড়ি করে লাশ দাফন এবং থানা পুলিশ ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের যোগসাজশে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগে পুরো কুলিয়া ইউনিয়নজুড়ে তোলপাড় চলছে।
জানা গেছে, গত ১ মে শুক্রবার রাত আনুমানিক ৮টার দিকে দাঁতের তীব্র ব্যথা নিয়ে কুলিয়া পুষ্পকাটী গ্রামের ইবাদুল ইসলামের স্ত্রী, ২ সন্তানের জননী মোছাঃ পারুল খাতুন বহেরা বাজারে অবস্থিত কথিত চিকিৎসক মোঃ আবু সাঈদের চেম্বারে যান। অভিযুক্ত আবু সাঈদ বহেরা উত্তর পাড়ার কালা গফফারের ছেলে এবং পেশায় একজন গবাদিপশু চিকিৎসক। মানুষের দাঁতের ব্যথার চিকিৎসার কোনো আইনগত এখতিয়ার না থাকলেও তিনি পারুল খাতুনের শরীরে পরপর ২টি ইনজেকশন প্রয়োগ করেন এবং বাড়ি পাঠিয়ে দেন।
প্রত্যক্ষদর্শী ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, বাড়ি পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই রাত ৯টার দিকে ছটফট করতে করতে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন পারুল খাতুন। মুহূর্তেই খবর ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ এলাকাবাসী রাতেই বহেরা বাজারে আবু সাঈদের চেম্বার ঘেরাও করে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অভিযুক্ত গবাদিপশু চিকিৎসক সুকৌশলে পালিয়ে যান।
সবচেয়ে রহস্যজনক বিষয় হলো, এমন একটি অস্বাভাবিক মৃত্যুর পরও কোনো প্রকার ময়নাতদন্ত ছাড়াই ২ মে শনিবার সকাল ৯টায় তড়িঘড়ি করে পারুল খাতুনের লাশ দাফন করা হয়। স্থানীয়দের প্রশ্ন, কার স্বার্থে, কিসের ভয়ে পোস্টমর্টেম ছাড়াই লাশ দাফনে এত তোড়জোড়?
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে, ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত আবু সাঈদ স্থানীয় বিএনপি নেতাদের মাধ্যমে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ আবদুল আলিমের শরণাপন্ন হন। এরপর নিহতের অসহায় স্বামী ইবাদুল ইসলামকে থানায় ডেকে ভয়ভীতি দেখিয়ে বিষয়টি মীমাংসার জন্য চাপ দেওয়া হয়।
শেষ পর্যন্ত ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় রফা হয়। সূত্রের দাবি, এই টাকার মধ্যে নিহতের স্বামী ইবাদুল ইসলাম পেয়েছেন ১ লাখ টাকা, দেবহাটা থানার ওসি আবদুল আলিম নিয়েছেন ৫০ হাজার টাকা এবং মধ্যস্থতাকারী স্থানীয় বিএনপি নেতারা ভাগ করে নিয়েছেন ৭০ হাজার টাকা।
এই ঘটনায় কুলিয়া, বহেরাসহ পুরো দেবহাটা উপজেলায় চরম ক্ষোভ ও আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বইছে। স্থানীয়দের দাবি, একজন গবাদিপশু চিকিৎসক কীভাবে মানুষের শরীরে ইনজেকশন পুশ করার সাহস পায়? পুলিশ প্রশাসন কেন অপমৃত্যুর মামলা না নিয়ে টাকার বিনিময়ে লাশ দাফনের অনুমতি দিল?
সচেতন মহলের প্রশ্ন, পোস্টমর্টেম রিপোর্ট ছাড়া কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যাবে এটি ভুল চিকিৎসায় মৃত্যু নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে? মাত্র ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় একজন মায়ের জীবনের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া হলো?
এলাকাবাসী অবিলম্বে ভুয়া চিকিৎসক মোঃ আবু সাঈদকে গ্রেফতার, লাশ উত্তোলন করে পুনরায় ময়নাতদন্ত এবং ঘটনা ধামাচাপায় জড়িত ওসি আবদুল আলিমসহ সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক নেতাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। অন্যথায় বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তারা।
এ বিষয়ে দেবহাটা থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ আবদুল আলিম বলেন, শুনেছি ঐ মহিলা প্রাথমিক অবস্থায় গবাদিপশু চিকিৎসক আবু সাঈদের নিকট চিকিৎসা নিয়েছিলেন। পরবর্তীতে অবস্থার অবনতি হলে নিকটস্থ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। মৃত ব্যক্তিকে পুঁজি করে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ গ্রহণের বিষয়টি প্রশ্ন করা মাত্রই তড়িঘড়ি করে আলাপ কলটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।
সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার মোঃ আরেফিন জুয়েল বলেন, মৃত্যুর বিষয় টা আমার জানা নেই। আমি এখনই খোঁজ নিচ্ছি। তাছাড়া তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করবো।
খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মোঃ রেজাউল হকের ব্যবহারিত মোবাইল নাম্বারে একাধিকবার কল দিলে আলাপ কলটি গ্রহণ না করায় বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে অভিযুক্ত আবু সাঈদ ঘটনার পর থেকে পলাতক রয়েছেন।